নিপা ভাইরাসের নাম শুনলেই অনেকের মনে ভয় কাজ করা স্বাভাবিক। কারণ অতীতে এই ভাইরাস থেকে গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর খবর আমরা পেয়েছি। তবে ভয়ের চেয়ে বেশি জরুরি হলো সঠিক তথ্য জানা এবং সচেতন থাকা। নিপাহ ভাইরাস খুব সাধারণ কোনো ভাইরাস নয়, কিন্তু এটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
এই লেখায় আমরা নিপাহ ভাইরাসকে আরেকটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখব—এই ভাইরাস আসলে কী, কীভাবে ছড়ায়, শরীরে ঢুকলে কী ধরনের লক্ষণ দেখা দেয় এবং কোন অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
নিপা ভাইরাস আসলে কী
নিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো ভাইরাস, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জুনোটিক ভাইরাস বলা হয়। এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়েছিল ১৯৯৯ সালে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফল খেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। অনেক সময় বাদুড়ের সংস্পর্শে আসা ফল বা পানীয় থেকে মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন।
নিপাহ ভাইরাস মানুষের শরীরে ঢুকলে প্রধানত মস্তিষ্ক ও শ্বাসতন্ত্রে প্রভাব ফেলে। কারও ক্ষেত্রে এটি হালকা অসুস্থতার মতো থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে খুব দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে। এই অনিশ্চিত আচরণই নিপাহ ভাইরাসকে বিশেষভাবে বিপজ্জনক করে তোলে।
নিপা ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়
নিপা ভাইরাস ছড়ানোর কয়েকটি প্রধান পথ রয়েছে। সংক্রমিত বাদুড়ের লালা বা মল দ্বারা দূষিত ফল খেলে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কাঁচা খেজুরের রস বা খোলা জায়গায় রাখা ফল থেকেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
শুধু প্রাণী থেকেই নয়, মানুষ থেকে মানুষেও নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থাকলে, তার শরীরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে এলে বা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। হাসপাতাল বা বাড়িতে রোগীর পরিচর্যার সময় এই ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
নিপা ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণ
নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে লক্ষণগুলো খুব সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতোই মনে হয়। সাধারণত সংক্রমণের ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে।
প্রথমদিকে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, গলা ব্যথা এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা যায়। অনেক সময় বমি বমি ভাব বা পেটের সমস্যা থাকতে পারে। এই পর্যায়ে অনেকেই বিষয়টিকে হালকা ভেবে বিশ্রাম নিয়েই থাকেন, যা কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আরও পড়ুন:প্রতিদিন কতটা ভিটামিন D দরকার?
নিপা ভাইরাসের লক্ষণ যখন গুরুতর রূপ নেয়
নিপাহ ভাইরাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো—লক্ষণ হঠাৎ করেই গুরুতর হয়ে যেতে পারে। ভাইরাস যদি মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে, তখন দেখা যায় অতিরিক্ত ঘুম, মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, আচরণে পরিবর্তন বা কথা বলতে অসুবিধা।
গুরুতর অবস্থায় খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা এনসেফালাইটিসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি কিছু রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, দ্রুত শ্বাস নেওয়া শুরু হয় বা বুকে চাপ অনুভূত হয়। এই লক্ষণগুলো একেবারেই অবহেলা করা উচিত নয়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন
শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম—তাদের ক্ষেত্রে নিপাহ ভাইরাস দ্রুত জটিল আকার নিতে পারে। এছাড়া যারা আক্রান্ত ব্যক্তির সেবাযত্ন করেন বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকেন, তাদের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি।
এই কারণে পরিবারের কারও মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ বা হঠাৎ স্নায়বিক লক্ষণ দেখা গেলে সতর্ক হওয়া খুব জরুরি।
আরও পড়ুন:ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) রোগের লক্ষণ কী কী? | Influenza Flu Symptoms
কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাবেন
যদি জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক ঝিমুনি, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, কথা বলতে সমস্যা বা শ্বাসকষ্ট দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যদি সংক্রমণপ্রবণ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ থাকে বা অসুস্থ কারও সংস্পর্শে এসে থাকেন, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই চিকিৎসককে জানাতে হবে।
শেষ কথা
নিপাহ ভাইরাস নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই, কিন্তু অবহেলা করার সুযোগও নেই। এই রোগের ক্ষেত্রে সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। নিজের শরীরের পরিবর্তনগুলোকে গুরুত্ব দিন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন এবং প্রয়োজনে দেরি না করে চিকিৎসকের সাহায্য নিন।
সঠিক তথ্য জানলে এবং ভয় না পেয়ে সচেতন থাকলেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।
FAQ: নিপা ভাইরাস নিয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
নিপা ভাইরাস কি সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো নিজে নিজে সেরে যায়?
কিছু ক্ষেত্রে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ হালকা থাকতে পারে, কিন্তু এটিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ হালকা লক্ষণ থাকার পরেও হঠাৎ করে এটি গুরুতর আকার নিতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কি সবাই মারা যায়?
না, সবাই মারা যায় না। অনেক রোগী সঠিক চিকিৎসা ও যত্নে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে রোগটি গুরুতর হতে পারে বলে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সতর্কতা বেশি দরকার।
নিপা ভাইরাস কি শুধু গ্রামাঞ্চলে হয়?
এমন নয়। নিপাহ ভাইরাস গ্রাম বা শহর—দুটো জায়গাতেই হতে পারে। শহরে মানুষের চলাচল বেশি হওয়ায় সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনাও থাকে। তাই শহরবাসীদেরও সচেতন থাকা জরুরি।
বাদুড় দেখলেই কি নিপাহ ভাইরাসের ভয় আছে?
না। বাদুড় নিপাহ ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক হলেও সরাসরি বাদুড় দেখলেই সংক্রমণ হবে এমন নয়। মূল ঝুঁকি আসে বাদুড়ের দ্বারা দূষিত খাবার বা পানীয় থেকে।
নিপা ভাইরাস কি খাবার রান্না করলে নষ্ট হয়ে যায়?
হ্যাঁ। ভালোভাবে রান্না করলে নিপাহ ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়। কাঁচা বা আধা-খাওয়া ফল, খেজুরের রস বা খোলা খাবার এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
নিপা ভাইরাস কি দীর্ঘমেয়াদে শরীরে কোনো প্রভাব ফেলে?
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সেরে ওঠার পরেও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, দুর্বলতা বা স্নায়বিক সমস্যা থাকতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে হয় না এবং রোগের তীব্রতার উপর নির্ভর করে।
নিপা ভাইরাসের সন্দেহ হলে বাড়িতে আলাদা করে রাখা কি দরকার?
হ্যাঁ। সন্দেহজনক লক্ষণ থাকলে রোগীকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা উচিত এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
নিপা ভাইরাস কি পরীক্ষায় সহজে ধরা পড়ে?
নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য বিশেষ ল্যাব পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, যা সব হাসপাতালে থাকে না। সাধারণত সরকারি বা নির্দিষ্ট রেফারেন্স ল্যাবেই এই পরীক্ষা করা হয়।
ভ্যাকসিন না থাকলে প্রতিরোধের উপায় কী?
প্রতিরোধের মূল উপায় হলো পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, কাঁচা ফল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির কাছাকাছি না যাওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক না ছড়িয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
নিপা ভাইরাস কি আবার ভবিষ্যতে ফিরে আসতে পারে?
হ্যাঁ, যেহেতু এটি প্রাণী থেকে ছড়ানো ভাইরাস, তাই ভবিষ্যতেও বিচ্ছিন্নভাবে সংক্রমণের সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদে সচেতনতা বজায় রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

