সাম্প্রতিক সময়ে যখনই নতুন কোনো ভাইরাসের নাম শোনা যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি হয়। নিপাহ ভাইরাস তেমনই একটি নাম, যা আগেও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে উদ্বেগের কারণ হয়েছে। কলকাতা ও আশপাশের অঞ্চলেও মানুষ এখন জানতে চাইছেন—নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ কী, কীভাবে চিনবেন, আর কখন সতর্ক হবেন।
এই লেখায় আমরা সহজ বাংলায়, আতঙ্ক না ছড়িয়ে, নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ ও প্রাথমিক তথ্য নিয়ে কথা বলব—বিশেষ করে কলকাতার প্রেক্ষাপটে।
নিপাহ ভাইরাস কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
নিপাহ ভাইরাস একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এই ভাইরাস মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। সংক্রমণ হলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে লক্ষণ খুব হালকা থাকে, আবার কারও ক্ষেত্রে দ্রুত গুরুতর অবস্থা তৈরি হয়। এই অনিশ্চয়তাই নিপাহ ভাইরাসকে বেশি বিপজ্জনক করে তোলে।
কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যেকোনো সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই লক্ষণগুলো আগে থেকেই জানা থাকলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
আরও পড়ুন:থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ ও লক্ষণ
নিপাহ ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষণ
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথম দিকের লক্ষণগুলো অনেকটা সাধারণ জ্বর বা ভাইরাল ফিভারের মতোই মনে হতে পারে। সাধারণত সংক্রমণের ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এই লক্ষণগুলো দেখা দেয়।
শুরুর দিকে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, মাথাব্যথা, গলা ব্যথা এবং শরীর ব্যথা হতে পারে। এর সঙ্গে অনেক সময় অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা যায়, যা সাধারণ জ্বরের তুলনায় বেশি তীব্র হয়। কেউ কেউ বমি বমি ভাব বা পেট খারাপের কথাও জানান।
এই পর্যায়ে সমস্যাটা হলো—লক্ষণগুলো খুব সাধারণ হওয়ায় অনেকেই একে হালকা ভাইরাল ভেবে অবহেলা করেন।
লক্ষণ যখন গুরুতর হতে শুরু করে
নিপাহ ভাইরাসের আসল বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন এটি স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তখন দেখা দিতে পারে ঝিমুনি, মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, বা আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন। রোগী অনেক সময় ঠিকভাবে কথা বলতে পারেন না বা চারপাশের পরিস্থিতি বুঝতে অসুবিধা হয়।
গুরুতর অবস্থায় খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, এমনকি এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কে প্রদাহ) পর্যন্ত হতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে শ্বাস নিতে কষ্ট, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা বুকে চাপ অনুভূত হয়, যা ফুসফুসে সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।
এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন:টুথপেস্টে Sodium Lauryl Sulfate কতটা বিপদজনক
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে লক্ষণ কেন আলাদা হতে পারে
শিশু ও বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ায় নিপাহ ভাইরাস তাদের শরীরে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘুম, খাওয়ার অরুচি, বা অস্বাভাবিক কান্নাকাটি দেখা যেতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি, স্মৃতিভ্রংশের মতো আচরণ বা হঠাৎ পড়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
এই কারণেই পরিবারের কারও মধ্যে এই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেলে সেটাকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

কলকাতার প্রেক্ষাপটে কেন সতর্কতা জরুরি
কলকাতা একটি বড় শহর, যেখানে মানুষের যাতায়াত ও জনঘনত্ব খুব বেশি। পাশের জেলাগুলোর সঙ্গে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের যোগাযোগ হয়। এর ফলে কোনো সংক্রামক রোগ হলে তা দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
এছাড়া শহরের আশপাশের এলাকায় ফলের বাজার, কাঁচা ফল খাওয়ার অভ্যাস এবং পশুপাখির সঙ্গে মানুষের সংস্পর্শ—এই সব বিষয়ও নজরে রাখা জরুরি। যদিও কলকাতায় নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর ঘটনা খুব বিরল, তবুও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন
যদি হঠাৎ জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক ঝিমুনি, বিভ্রান্তি, কথা বলতে সমস্যা, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়—তাহলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। বিশেষ করে যদি সাম্প্রতিক সময়ে কোনো নিপাহ-প্রবণ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ থাকে বা অসুস্থ কারও সংস্পর্শে এসে থাকেন, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই চিকিৎসককে জানাতে হবে।
শেষ কথা
নিপাহ ভাইরাসের নাম শুনে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু অযথা আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। সচেতনতা, লক্ষণ চেনা এবং সময়মতো চিকিৎসা—এই তিনটিই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। কলকাতার মতো শহরে বসবাসকারী মানুষদের জন্য তথ্য জানা আর সতর্ক থাকা মানেই নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
শরীরের কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলা করবেন না। দ্রুত পদক্ষেপই বড় বিপদ এড়াতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসা করা প্রশ্ন (FAQ): কলকাতায় নিপাহ ভাইরাস
নিপাহ ভাইরাস কি কলকাতায় ছড়িয়েছে?
বর্তমানে কলকাতায় নিপাহ ভাইরাসের বড় কোনো প্রাদুর্ভাব খুব বিরল। তবে আশপাশের রাজ্য বা অঞ্চলে যদি সংক্রমণ দেখা যায়, তাহলে সতর্ক থাকা জরুরি। স্বাস্থ্য দপ্তর নিয়মিত নজরদারি করে।
নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ কতদিনের মধ্যে দেখা যায়?
সাধারণত সংক্রমণের ৫ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। শুরুতে লক্ষণগুলো সাধারণ জ্বরের মতো হলেও পরে গুরুতর আকার নিতে পারে।
নিপাহ ভাইরাস কি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়?
হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে নিপাহ ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি সংস্পর্শে এলে ছড়াতে পারে। বিশেষ করে শরীরের তরল পদার্থের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
নিপাহ ভাইরাস কি খুব মারাত্মক?
নিপাহ ভাইরাস গুরুতর হতে পারে, বিশেষ করে যদি এটি মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটায়। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রেই মারাত্মক হবে—এমন নয়। দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু হলে ঝুঁকি কমানো যায়।
নিপাহ ভাইরাসের জন্য কি কোনো ভ্যাকসিন আছে?
বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা নিশ্চিত চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা মূলত উপসর্গ অনুযায়ী সহায়ক পদ্ধতিতে করা হয়।
জ্বর হলে কি সঙ্গে সঙ্গে নিপাহ সন্দেহ করা উচিত?
না। সব জ্বর নিপাহ ভাইরাসের কারণে হয় না। তবে জ্বরের সঙ্গে যদি অস্বাভাবিক ঝিমুনি, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্ট দেখা যায়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
শিশুদের ক্ষেত্রে নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ কী আলাদা?
শিশুদের ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘুম, খাওয়ার অনীহা, আচরণে পরিবর্তন বা খিঁচুনি দেখা যেতে পারে। এই লক্ষণগুলো অবহেলা করা উচিত নয়।
নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে কী করা যায়?
কাঁচা বা আধখাওয়া ফল ভালো করে ধুয়ে খাওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির কাছাকাছি না যাওয়া, হাত পরিষ্কার রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই প্রতিরোধের সবচেয়ে ভালো উপায়।
কখন অবশ্যই হাসপাতালে যেতে হবে?
যদি জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা, বিভ্রান্তি, কথা বলতে সমস্যা, খিঁচুনি বা শ্বাস নিতে কষ্ট হয়—তাহলে দেরি না করে হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
নিপাহ ভাইরাস কি পুরোপুরি ভালো হয়?
কিছু রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে রোগের তীব্রতা ও শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর ফলাফল নির্ভর করে। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

