নিপা ভাইরাসে শিশুদের ঝুঁকি কতটা? কী কী সমস্যা হতে পারে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

নিপা ভাইরাসে শিশুদের ঝুঁকি কতটা? কী কী সমস্যা হতে পারে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

Share This Post

পশ্চিমবঙ্গে নিপা ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে শিশুদের স্বাস্থ্য। চিকিৎসকদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ক্ষেত্রে নিপা ভাইরাস আরও দ্রুত এবং মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।


শুরুতে বোঝা যায় না, উপসর্গ ভাইরাল জ্বরের মতো

নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শিশুদের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে খুব সাধারণ উপসর্গ দেখা যায়। হঠাৎ জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি বমি ভাব বা খেতে না চাওয়ার মতো লক্ষণ শুরু হয়। অনেক সময় অভিভাবকেরা এটিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করে বসেন। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।

চিকিৎসকদের মতে, এই ভাইরাস শরীরে ঢোকার ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রথম কয়েক দিন খুব বেশি গুরুতর মনে না হলেও ভিতরে ভিতরে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।


আচরণগত পরিবর্তনই বিপদের প্রথম সংকেত

শিশুদের ক্ষেত্রে নিপা ভাইরাসের অন্যতম ভয়ংকর দিক হল আচরণগত পরিবর্তন
হঠাৎ করে শিশু খুব চুপচাপ হয়ে যাওয়া, অকারণে কান্না, রেগে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বাবা-মাকে চিনতে অসুবিধা হওয়া—এগুলো নিপা সংক্রমণের গুরুতর লক্ষণ হতে পারে।

এই পর্যায়ে অনেক সময় খিঁচুনি, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। চিকিৎসকদের মতে, এই সময় দেরি করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।


আরও পড়ুন:থ্যালাসেমিয়া রোগের কারণ ও লক্ষণ


ব্রেনে সংক্রমণ হলে পরিস্থিতি সঙ্কটজনক

নিপা ভাইরাস শিশুদের শরীরে দ্রুত ব্রেনে প্রভাব ফেলে। ফলে এনসেফেলাইটিস বা ব্রেন ইনফ্ল্যামেশন দেখা দিতে পারে। এই অবস্থায় শিশুর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন পড়ে।

ফুসফুসে সংক্রমণ হলে মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের বক্তব্য, একবার এই পর্যায়ে পৌঁছলে চিকিৎসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে, কারণ নিপা ভাইরাসের এখনও কোনও নির্দিষ্ট টিকা বা প্রতিষেধক নেই।


কেন শিশুদের ঝুঁকি বেশি?

বিশেষজ্ঞদের মতে—

  • শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম
  • ভাইরাস শরীরে ঢুকলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে
  • শুরুতে উপসর্গ স্পষ্ট না হওয়ায় চিকিৎসা দেরিতে শুরু হয়

এই তিনটি কারণ মিলিয়েই শিশুদের ক্ষেত্রে নিপা ভাইরাস অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।


কোন লক্ষণ দেখলেই হাসপাতালে নিয়ে যাবেন?

শিশুর ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে যদি—

  • অস্বাভাবিক আচরণ
  • খিঁচুনি
  • শ্বাস নিতে কষ্ট
  • বারবার অজ্ঞান হওয়া

এই লক্ষণগুলির কোনওটিও দেখা যায়, তাহলে এক মুহূর্ত দেরি না করে নিকটবর্তী বড় হাসপাতাল বা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যেতে হবে।


অভিভাবকদের জন্য সতর্কবার্তা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই একমাত্র উপায়। শিশুদের পড়ে থাকা ফল খেতে না দেওয়া, ফল ভালো করে ধুয়ে খাওয়ানো, বাইরে থেকে ফিরে হাত ধোয়ার অভ্যাস করানো এবং অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

নিপা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনও টিকাই শেষ ভরসা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। ততদিন পর্যন্ত সাবধানতা এবং দ্রুত চিকিৎসাই শিশুদের বাঁচাতে পারে।


আরও পড়ুন:টুথপেস্টে Sodium Lauryl Sulfate কতটা বিপদজনক


FAQ: নিপা ভাইরাস নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন ও বিস্তারিত উত্তর


নিপাহ ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?

নিপাহ ভাইরাস মূলত প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। এর প্রধান উৎস বাদুড়। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল, লালা বা মলমূত্রে দূষিত খাবার খেলে মানুষ সংক্রমিত হতে পারেন।
এছাড়া নিপা আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থাকলে, তাঁর কাশি–হাঁচির সংস্পর্শে এলে বা ব্যবহৃত পোশাক, তোয়ালে, বিছানা ইত্যাদি ব্যবহার করলে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। হাসপাতাল পরিবেশে সুরক্ষা না মেনে রোগীর সেবা করলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।


নিপাহ ভাইরাস হলে করণীয় কী?

নিপা ভাইরাসের সন্দেহ হলেই দ্রুত উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা থাকা হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করতে হবে। রোগীকে আলাদা করে রাখা (আইসোলেশন) অত্যন্ত জরুরি।
নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া বা বাড়িতে চিকিৎসা করা উচিত নয়। চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সাপোর্টিভ কেয়ার, প্রয়োজনে অক্সিজেন, আইসিইউ বা ভেন্টিলেশন দেওয়া হয়। রোগীর পরিচর্যাকারীদের মাস্ক ব্যবহার ও ঘন ঘন হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক।


নিপাহ ভাইরাস কি ছোঁয়াচে?

হ্যাঁ, নিপা ভাইরাস ছোঁয়াচে। তবে এটি খুব সহজে ছড়ায় না। দীর্ঘ সময় ধরে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকলে, শরীরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে এলে বা সঠিক সুরক্ষা ছাড়া সেবা করলে সংক্রমণ ঘটতে পারে। তাই আইসোলেশন ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


নিপা ভাইরাস প্রথম কোথায় দেখা যায়?

নিপা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় মালয়েশিয়া-তে, ১৯৯৮–৯৯ সালে। সেখানে প্রথম বড় আকারে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়। পরে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অংশেও সংক্রমণের ঘটনা দেখা যায়।


আরও পড়ুন:ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) রোগের লক্ষণ কী কী? | Influenza Flu Symptoms


নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার কত?

নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে খুব বেশি। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, আক্রান্তদের ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যুঝুঁকি থাকতে পারে। দ্রুত রোগ শনাক্ত ও সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।


নিপা ভাইরাস ও খেজুরের রসের সম্পর্ক কী?

খেজুরের কাঁচা রস নিপা সংক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত। শীতকালে বাদুড় খেজুর গাছের রস খেতে আসে। সেই সময় বাদুড়ের লালা বা মলমূত্র রসে পড়ে তা দূষিত হতে পারে। এই কাঁচা রস ফুটানো ছাড়া পান করলে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কাঁচা খেজুরের রস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।


নিপা ভাইরাসের বাহক কে?

নিপা ভাইরাসের প্রধান বাহক হল ফলখেকো বাদুড়। কিছু ক্ষেত্রে শুয়োরের শরীরেও এই ভাইরাস পাওয়া গেছে, যা মানুষের মধ্যে সংক্রমণের মাধ্যম হতে পারে। তবে গবেষকদের মতে, মূল প্রাকৃতিক বাহক বাদুড়ই।


সব বাদুড় কি নিপা ভাইরাস বহন করে?

না, সব বাদুড় নিপা ভাইরাস বহন করে না। বিশেষ কিছু প্রজাতির ফলখেকো বাদুড়ের শরীরে এই ভাইরাস পাওয়া যায়। কোন বাদুড় আক্রান্ত আর কোনটি নয়, তা বাইরে থেকে চেনা যায় না। তাই বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং বাদুড় খাওয়া ফল না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।


Share This Post