মেনস্ট্রুয়াল কাপ বেছে নেওয়া অনেকের কাছেই প্রথমে বেশ বিভ্রান্তিকর মনে হয়। বাজারে বিভিন্ন সাইজ, বিভিন্ন ব্র্যান্ড, নানা রকম দাবি—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু একবার যদি নিজের শরীরের জন্য সঠিক কাপটি খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলে পিরিয়ডের সময় যে স্বস্তি পাওয়া যায় তা সত্যিই মানসিক শান্তি দেয়।
আমিও যখন প্রথম মেনস্ট্রুয়াল কাপ ব্যবহার করার কথা ভাবি, তখন অনেক দ্বিধা ছিল। শেষ পর্যন্ত কিছু নির্দিষ্ট বিষয় মাথায় রেখে সাইজ নির্বাচন করি এবং পরে বুঝতে পারি, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় জানব কীভাবে সঠিক মেনস্ট্রুয়াল কাপ বেছে নেওয়া যায়, সাইজের পার্থক্য কী, সার্ভিক্সের উচ্চতা কেন গুরুত্বপূর্ণ, এবং বয়স ও ফ্লো অনুযায়ী কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন।
কেন সঠিক সাইজ নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ ?
মেনস্ট্রুয়াল কাপ শরীরের ভিতরে বসানো হয়। তাই এটি আরামদায়ক হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি কাপ খুব ছোট হয়, তবে ভারী রক্তপাতের সময় দ্রুত ভরে যেতে পারে এবং লিক হতে পারে। আবার যদি খুব বড় হয়, তবে অস্বস্তি বা চাপ লাগতে পারে।
সঠিক সাইজ ব্যবহার করলে কাপ ঠিকভাবে সিল তৈরি করে এবং দীর্ঘ সময় নিরাপদ থাকে। তাই কেনার আগে নিজের বয়স, রক্তপাতের পরিমাণ এবং সার্ভিক্সের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা রাখা দরকার।
ভারতে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে একটি হল Sirona। অনেক ব্যবহারকারী তাদের সাইজ চার্ট দেখে সিদ্ধান্ত নেন। আমিও শেষ পর্যন্ত Sirona-এর এম সাইজ বেছে নিয়েছিলাম, কারণ আমার বয়স, ফ্লো এবং সার্ভিক্সের উচ্চতা সেই সাইজের সঙ্গে মানানসই ছিল।
আরও পড়ুন:First Time Sex: প্রথমবার সেক্সে একজন পুরুষ সাধারণত কতক্ষণ টিকে থাকেন?
সাইজ S – হালকা রক্তপাতের জন্য
সাইজ এস সাধারণত তাদের জন্য উপযুক্ত যাদের রক্তপাত কম বা হালকা। সাধারণভাবে ২৫ বছরের নিচে যাদের বয়স এবং যাদের এখনো সন্তান হয়নি, তাদের জন্য এই সাইজ আরামদায়ক হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সার্ভিক্সের উচ্চতা। যদি সার্ভিক্স নিচু হয়, অর্থাৎ যোনির ভিতরে খুব গভীরে না থাকে, তাহলে ছোট সাইজের কাপ ব্যবহার করা সহজ হয়। বড় কাপ নিচু সার্ভিক্সের ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু বয়সই একমাত্র মানদণ্ড নয়। অনেক সময় ২৫ বছরের কম বয়স হলেও কারও ফ্লো বেশি হতে পারে। তাই নিজের শরীরের লক্ষণ বোঝা জরুরি।
সাইজ M – মাঝারি রক্তপাতের জন্য
সাইজ এম সাধারণত মাঝারি ফ্লোর জন্য উপযুক্ত। সাধারণভাবে ২৫ বছরের বেশি এবং ৩৫ বছরের নিচে যারা, তাদের জন্য এই সাইজ ভালো কাজ করে, যদি সার্ভিক্সের উচ্চতা মাঝামাঝি হয়।
এটি এমন একটি সাইজ যা অনেকের ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প হিসেবে কাজ করে। খুব বড় নয়, আবার খুব ছোটও নয়। যারা প্রথমবার ব্যবহার করছেন এবং নিশ্চিত নন যে কোন সাইজ নেবেন, তারা প্রায়ই এম সাইজ দিয়ে শুরু করেন।
আমার ক্ষেত্রেও মাঝারি রক্তপাত এবং গড় উচ্চতার সার্ভিক্স থাকায় এম সাইজই সবচেয়ে আরামদায়ক মনে হয়েছে। সঠিকভাবে বসালে কোনো চাপ বা অস্বস্তি অনুভব করিনি এবং দীর্ঘ সময় লিক ছাড়াই ব্যবহার করতে পেরেছি।
সাইজ L – বেশি রক্তপাতের জন্য
সাইজ এল সাধারণত তাদের জন্য উপযুক্ত যাদের রক্তপাত বেশি হয়। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী অনেক নারী এই সাইজ ব্যবহার করেন, বিশেষ করে যদি তাদের সার্ভিক্স উঁচু হয়।
উঁচু সার্ভিক্স মানে যোনির ভিতরে সার্ভিক্স কিছুটা গভীরে থাকে। সেই ক্ষেত্রে বড় সাইজের কাপ ভিতরে ভালোভাবে বসে এবং সহজে বের করা যায়।
যাদের সন্তান হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও বড় সাইজ আরামদায়ক হতে পারে, কারণ শরীরের গঠন কিছুটা পরিবর্তিত হয়। তবে আবারও বলা দরকার, প্রত্যেকের শরীর আলাদা। তাই একেকজনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে।
সার্ভিক্সের উচ্চতা কীভাবে বুঝবেন
অনেকে জানেন না সার্ভিক্সের উচ্চতা কীভাবে বুঝতে হয়। এটি বোঝার জন্য পিরিয়ডের সময় পরিষ্কার হাতে যোনির ভিতরে আঙুল প্রবেশ করিয়ে সার্ভিক্স স্পর্শ করা যায়। যদি সহজেই আঙুলের ডগায় লাগে, তবে সার্ভিক্স নিচু। যদি আঙুল বেশ ভিতরে ঢোকাতে হয়, তবে সার্ভিক্স উঁচু।
এই ধারণা থাকলে সাইজ নির্বাচন অনেক সহজ হয়ে যায়।
তবে যদি অস্বস্তি বোধ করেন বা নিশ্চিত না হন, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
আরও পড়ুন:i-pill কী? জরুরি গর্ভনিরোধক বড়ি সম্পর্কে যা জানা জরুরি
শুধুমাত্র বয়স দিয়ে সিদ্ধান্ত নয়
অনেকেই মনে করেন শুধু বয়স অনুযায়ী সাইজ ঠিক করা যায়। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি একটু জটিল। দুইজন একই বয়সের হলেও তাদের রক্তপাতের পরিমাণ, সার্ভিক্সের উচ্চতা এবং শরীরের গঠন আলাদা হতে পারে।
তাই সাইজ নির্বাচন করার সময় তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা ভালো। বয়স, ফ্লো এবং সার্ভিক্সের উচ্চতা। এই তিনটি মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে সঠিক সাইজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সঠিক কাপ পেলে কেমন অনুভূতি হয়
প্রথমে কিছুটা দ্বিধা বা অস্বস্তি স্বাভাবিক। কিন্তু সঠিক সাইজ ব্যবহার করলে কাপটি শরীরের ভিতরে আছে বলেই মনে হয় না। হাঁটা, বসা, কাজ করা বা ঘুমানোর সময় কোনো সমস্যা হয় না।
এই স্বস্তিই আসল শান্তি। বারবার প্যাড বদলানোর চিন্তা নেই, র্যাশের ভয় নেই, দীর্ঘ সময় নিশ্চিন্ত থাকা যায়। একবার সঠিক কাপ পেলে পিরিয়ড অনেক সহজ মনে হয়।
কেন ভালো ব্র্যান্ড বেছে নেওয়া জরুরি ?
বাজারে অনেক সস্তা কাপ পাওয়া যায়, কিন্তু সবগুলো সমান মানের নয়। মেডিক্যাল গ্রেড সিলিকন দিয়ে তৈরি কাপ ব্যবহার করা উচিত। পরিচিত ব্র্যান্ড সাধারণত মান নিয়ন্ত্রণে বেশি যত্নশীল হয়।
কাপ কেনার সময় রিভিউ পড়া এবং উপাদান সম্পর্কে জানা ভালো।
শেষ কথা
মেনস্ট্রুয়াল কাপ বেছে নেওয়া প্রথমে জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। সঠিক সাইজ পেলে পিরিয়ড আর ভয়ের বিষয় থাকে না, বরং হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রিত এবং স্বস্তিদায়ক।
তাই তাড়াহুড়ো না করে তথ্য জেনে, নিজের ফ্লো ও সার্ভিক্স বুঝে সিদ্ধান্ত নিন। একবার সঠিক কাপ খুঁজে পেলে, পিরিয়ডের দিনগুলো সত্যিই অনেক শান্ত ও আরামদায়ক হয়ে উঠতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
মেনস্ট্রুয়াল কাপের সাইজ কীভাবে বুঝব?
মেনস্ট্রুয়াল কাপের সাইজ বোঝার জন্য তিনটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আপনার বয়স। দ্বিতীয়ত, আপনার মাসিকের সময় রক্তপাতের পরিমাণ। তৃতীয়ত, আপনার সার্ভিক্সের উচ্চতা। অনেক ব্র্যান্ড তাদের সাইজ গাইডে এই তিনটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে পরামর্শ দেয়।
সাধারণভাবে কম বয়স এবং হালকা ফ্লোর ক্ষেত্রে ছোট সাইজ ব্যবহার করা হয়। মাঝারি ফ্লো এবং গড় সার্ভিক্স উচ্চতার ক্ষেত্রে মাঝারি সাইজ আরামদায়ক হয়। বেশি রক্তপাত বা উঁচু সার্ভিক্স থাকলে বড় সাইজ উপযুক্ত হতে পারে। তবে প্রত্যেকের শরীর আলাদা, তাই নিজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া ভালো।
সার্ভিক্সের উচ্চতা কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সার্ভিক্স হল জরায়ুর নিচের অংশ, যা যোনির শেষ প্রান্তে থাকে। পিরিয়ডের সময় সার্ভিক্সের অবস্থান একটু উপরে বা নিচে হতে পারে। যদি সার্ভিক্স নিচু হয়, তাহলে লম্বা বা বড় কাপ অস্বস্তি দিতে পারে। আবার সার্ভিক্স উঁচু হলে ছোট কাপ গভীরে পৌঁছাতে অসুবিধা হতে পারে।
তাই কাপ কেনার আগে সার্ভিক্সের উচ্চতা জানা থাকলে সঠিক সাইজ বেছে নেওয়া সহজ হয় এবং লিক বা অস্বস্তির সম্ভাবনা কমে।
বয়স কি একমাত্র মানদণ্ড?
না, শুধু বয়স দিয়ে সঠিক সাইজ নির্ধারণ করা যায় না। একই বয়সের দুইজন নারীর শরীরের গঠন, ফ্লো এবং সার্ভিক্সের উচ্চতা আলাদা হতে পারে। অনেক সময় ২৫ বছরের কম বয়স হলেও কারও ফ্লো বেশি হতে পারে, আবার ৩০ বছরের বেশি হলেও কারও ফ্লো খুব হালকা হতে পারে।
তাই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীরের লক্ষণ বোঝা জরুরি।
প্রথমবার কোন সাইজ দিয়ে শুরু করা ভালো?
যারা প্রথমবার ব্যবহার করছেন এবং নিশ্চিত নন কোন সাইজ নেবেন, তারা সাধারণত মাঝারি সাইজ দিয়ে শুরু করেন যদি তাদের ফ্লো খুব বেশি বা খুব কম না হয়। তবে যদি রক্তপাত খুব হালকা হয়, তাহলে ছোট সাইজ দিয়ে শুরু করা আরামদায়ক হতে পারে।
প্রথম সাইকেলে কিছুটা পরীক্ষা করে দেখতে হতে পারে। একবার সঠিক সাইজ পেয়ে গেলে পরের মাসগুলো অনেক সহজ হয়ে যায়।
ভুল সাইজ নিলে কী সমস্যা হতে পারে?
ভুল সাইজ ব্যবহার করলে লিক হতে পারে, অস্বস্তি লাগতে পারে বা কাপ ঠিকভাবে খুলে সিল তৈরি নাও করতে পারে। বড় কাপ হলে ভিতরে চাপ লাগতে পারে। ছোট কাপ হলে দ্রুত ভরে যেতে পারে, বিশেষ করে বেশি রক্তপাতের সময়।
এই কারণে সাইজ নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি একেবারেই আরাম না লাগে, তাহলে সাইজ পরিবর্তন করার কথা ভাবা উচিত।
সন্তান হওয়ার পর কি সাইজ বদলাতে হয়?
অনেক ক্ষেত্রে সন্তান হওয়ার পর শরীরের গঠন কিছুটা পরিবর্তিত হয়। তখন বড় সাইজ বেশি আরামদায়ক হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কারও শরীর আগের মতোই থাকতে পারে।
তাই সন্তান হওয়ার পর নতুন করে নিজের আরাম ও ফ্লো অনুযায়ী সাইজ বিবেচনা করা ভালো।
ভালো ব্র্যান্ড কীভাবে চিনব?
ভালো ব্র্যান্ড সাধারণত মেডিক্যাল গ্রেড সিলিকন ব্যবহার করে এবং তাদের প্যাকেট বা ওয়েবসাইটে পরিষ্কার সাইজ গাইড দেয়। ব্যবহার নির্দেশিকা স্পষ্ট থাকে এবং গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা বা রিভিউ সহজে পাওয়া যায়।
যেমন Sirona-এর মতো কিছু পরিচিত ব্র্যান্ড সাইজ অনুযায়ী স্পষ্ট পরামর্শ দেয়। নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য এই ধরনের তথ্য সহায়ক হতে পারে।
সঠিক কাপ পেলে কেমন অনুভূতি হয়?
সঠিক সাইজ ব্যবহার করলে কাপটি শরীরের ভিতরে আছে বলেই মনে হয় না। হাঁটা, বসা, কাজ করা বা ঘুমানোর সময় কোনো অস্বস্তি থাকে না। লিকের চিন্তা কম থাকে এবং পিরিয়ডের সময় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়।
এই স্বস্তির অনুভূতিই প্রমাণ করে যে আপনি সঠিক মেনস্ট্রুয়াল কাপ বেছে নিয়েছেন।
