শীত এলেই অনেকের অপেক্ষা থাকে এক গ্লাস টাটকা খেজুর রসের জন্য। গ্রাম হোক বা শহর—খেজুর রস আমাদের কাছে শুধু একটা পানীয় নয়, বরং শীতের একটা আবেগ। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই খেজুর রসকে ঘিরেই বারবার একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে—খেজুর রস খেলেই কি নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে? এই প্রশ্নের উত্তরটা “হ্যাঁ” বা “না”—দুটোর কোনোটাই এক কথায় বলা যায় না। বিষয়টা বুঝতে হলে পুরো ছবিটা জানা দরকার।
এই লেখায় আমরা সহজভাবে বোঝার চেষ্টা করব, নিপা ভাইরাসের সঙ্গে খেজুর রসের সম্পর্ক আসলে কোথায়, কীভাবে ঝুঁকি তৈরি হয়, আর কোন পরিস্থিতিতে এই ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
নিপা ভাইরাস আসলে কোথা থেকে আসে
নিপা ভাইরাস মূলত একটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো ভাইরাস। গবেষণায় দেখা গেছে, ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। অর্থাৎ বাদুড় নিজে অসুস্থ না হলেও তার শরীরে ভাইরাস থাকতে পারে। সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন মানুষের খাবার বা পানীয়ের সঙ্গে এই বাদুড়ের সংস্পর্শ ঘটে।
বাদুড় সাধারণত রাতে বের হয় এবং মিষ্টি জিনিসের প্রতি তাদের আকর্ষণ খুব বেশি। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার সময় যদি রস খোলা অবস্থায় থাকে, তখন বাদুড় সেখানে বসে রস খেতে পারে। এই সময় তাদের লালা বা মূত্রের মাধ্যমে রসে ভাইরাস মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
খেজুর রস আর নিপা ভাইরাসের সম্পর্কটা কোথায়
এখানেই মূল বিষয়টা আসে। খেজুর রস খেলেই নিপা ভাইরাস হবে—এই ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। ঝুঁকি তৈরি হয় তখনই, যখন রসটি খোলা অবস্থায় সংগ্রহ করা হয় এবং সেই রস বাদুড়ের দ্বারা দূষিত হয়। অর্থাৎ সমস্যাটা খেজুর রসে নয়, সমস্যাটা হলো রস সংগ্রহের পদ্ধতিতে।
যদি খেজুর রস সংগ্রহ করার সময় গাছের মুখ ঢেকে রাখা হয়, যাতে বাদুড় বা অন্য প্রাণী সেখানে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু খোলা রসের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা থাকে না, আর সেখান থেকেই সংক্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সব খেজুর রস কি বিপজ্জনক?
না, সব খেজুর রস বিপজ্জনক নয়। রান্না করা বা ফুটানো খেজুর রসে নিপা ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না। তাপের কারণে ভাইরাস নষ্ট হয়ে যায়। ঝুঁকি থাকে মূলত কাঁচা, খোলা অবস্থায় রাখা রসে, যেটা সরাসরি পান করা হয়।
এই কারণেই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেন—কাঁচা খেজুর রস খাওয়ার ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকতে হবে, বিশেষ করে সেই এলাকাগুলোতে যেখানে আগে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা গেছে।
আরও পড়ুন:কলেরা রোগের জীবাণুর নাম জানেন? ৯০% মানুষ এখানেই ভুল করে
নিপা ভাইরাসে সংক্রমণ হলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে
নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা বমি ভাব দেখা দিতে পারে। অনেক সময় এই লক্ষণগুলো সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো মনে হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে এবং মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে পারে। তখন বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এই কারণেই নিপা ভাইরাসকে হালকাভাবে নেওয়া যায় না, যদিও এটি খুব সাধারণ রোগ নয়।

তাহলে খেজুর রস কি পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত?
পুরোপুরি এড়িয়ে চলার প্রয়োজন নেই, কিন্তু সচেতন থাকা খুব জরুরি। যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে রসটি ঢেকে রাখা অবস্থায় সংগ্রহ করা হয়েছে বা ভালোভাবে ফুটিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাহলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা জানি না রসটি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে।
শীতের আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি একটু সচেতন থাকলেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।
শেষ কথা
খেজুর রস নিজে নিপা ভাইরাস তৈরি করে না। ঝুঁকি আসে মানুষের অসচেতনতা আর ভুল পদ্ধতির কারণে। খোলা, কাঁচা খেজুর রস যদি বাদুড়ের দ্বারা দূষিত হয়, তখনই সংক্রমণের সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাই ভয় পাওয়ার চেয়ে বোঝাটাই বেশি দরকার।
FAQ: নিপা ভাইরাস নিয়ে সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
নিপা ভাইরাস কি?
নিপা ভাইরাস একটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত বাদুড় থেকে মানুষের শরীরে আসে এবং পরে মানুষে মানুষেও ছড়াতে পারে। এই ভাইরাস শরীরের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে, তাই একে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।
নিপা ভাইরাস কি থেকে হয়?
নিপা ভাইরাসের প্রধান প্রাকৃতিক বাহক হলো ফলখেকো বাদুড়। বাদুড়ের লালা বা মূত্রের মাধ্যমে খাবার বা পানীয় দূষিত হলে সেখান থেকে মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষ করে খোলা অবস্থায় রাখা কাঁচা খেজুর রসের সঙ্গে এই ভাইরাসের সংযোগের কথা বহুবার সামনে এসেছে।
নিপা ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়?
নিপা ভাইরাস ছড়ায় মূলত তিনভাবে। প্রথমত, বাদুড় দ্বারা দূষিত খাবার বা পানীয় গ্রহণের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, সংক্রমিত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে। তৃতীয়ত, কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমিত মানুষের খুব কাছাকাছি থাকলে বা তার শরীরের তরলের সংস্পর্শে এলে মানুষে মানুষে সংক্রমণ হতে পারে।
আরও পড়ুন:টাইফয়েড জ্বর কি হঠাৎ হয়? লক্ষণ শুরু হওয়ার আগেই শরীর দেয় এই signal
নিপা ভাইরাস কি ছোঁয়াচে?
হ্যাঁ, নিপা ভাইরাস সীমিত পরিসরে মানুষে মানুষে ছোঁয়াচে হতে পারে। তবে এটি বাতাসে খুব সহজে ছড়ানো রোগ নয়। সাধারণত দীর্ঘ সময় কাছাকাছি থাকা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
নিপা ভাইরাস রোগের লক্ষণ কী কী?
নিপা ভাইরাসের লক্ষণ শুরুতে সাধারণ জ্বরের মতো হতে পারে। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি ভাব বা দুর্বলতা দেখা যায়। কিছু ক্ষেত্রে রোগ দ্রুত গুরুতর হয়ে ওঠে এবং বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনির মতো স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ হলে কতটা বিপজ্জনক?
নিপা ভাইরাস সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে, বিশেষ করে যদি রোগ দ্রুত শনাক্ত না হয়। সব রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতা হয় না, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রাণঘাতীও হতে পারে। তাই সন্দেহ হলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
নিপা ভাইরাসের চিকিৎসা কী?
নিপা ভাইরাসের জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই। চিকিৎসা মূলত রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে করা হয়। জ্বর নিয়ন্ত্রণ, শ্বাসকষ্ট সামলানো এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ঠিক রাখাই চিকিৎসার মূল লক্ষ্য।
নিপা ভাইরাস প্রথম কোথায় দেখা যায়?
নিপা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায়। পরে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অংশে সময় সময় এই ভাইরাসের সংক্রমণের ঘটনা দেখা গেছে।
নিপা ভাইরাস থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?
খোলা অবস্থায় সংগ্রহ করা কাঁচা খেজুর রস এড়িয়ে চলা, ফল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, অসুস্থ মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই নিপা ভাইরাস থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আরও পড়ুন:কলেরা আসলে কী? এই একটা ভুল ধারণার জন্যই মানুষ ভয় পায়

