আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো লিভার বা যকৃৎ। এটি শুধু হজম প্রক্রিয়ায় নয়, বরং শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করা, পুষ্টি উপাদান শোষণ করা এবং শক্তি উৎপাদনেও vital ভূমিকা পালন করে। লিভার যখন সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, তখন এর হজম শক্তি কমে যায়, যা শরীরের overall স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তা নিয়েই আজকের এই বিস্তারিত আলোচনা।
লিভারের হজম শক্তির ভূমিকা
লিভার পিত্তরস (bile) তৈরি করে, যা চর্বি হজম এবং শোষণে সাহায্য করে। যখন আমরা চর্বিযুক্ত খাবার খাই, তখন পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে নিঃসৃত হয় এবং চর্বিকে ছোট ছোট কণায় ভেঙে দেয়, যা হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে। এছাড়াও, লিভার বিভিন্ন এনজাইম তৈরি করে যা carbohydrate এবং protein হজমে সহায়তা করে। যদি লিভারের এই হজম শক্তি কমে যায়, তবে খাবার সঠিকভাবে হজম হয় না এবং এর ফলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।
লিভারের হজম শক্তি কমে যাওয়ার লক্ষণসমূহ
লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে শরীরে বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই লক্ষণগুলি প্রাথমিক পর্যায়ে subtle হতে পারে, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তা গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। কিছু প্রধান লক্ষণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. হজমের সমস্যা
লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে সবচেয়ে obvious লক্ষণ হলো হজমের সমস্যা। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:
•পেট ফাঁপা এবং গ্যাস: খাবার সঠিকভাবে হজম না হওয়ায় পেটে গ্যাস জমে এবং পেট ফাঁপা মনে হয়।
•বদহজম: খাবার খাওয়ার পর অস্বস্তি, বুক জ্বালাপোড়া এবং পেট ব্যথা হতে পারে।
•কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া: হজম প্রক্রিয়ার disruption এর কারণে bowel movement অনিয়মিত হয়ে পড়ে, যা কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।
২. ক্লান্তি এবং দুর্বলতা
লিভার শরীরের শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন লিভার দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শরীর পর্যাপ্ত শক্তি তৈরি করতে পারে না, যার ফলে:
•অতিরিক্ত ক্লান্তি: সামান্য কাজ করলেই ক্লান্ত হয়ে পড়া বা সারাদিন অবসাদ অনুভব করা।
•দুর্বলতা: শারীরিক দুর্বলতা এবং কাজের প্রতি অনীহা।
৩. ওজন পরিবর্তন
লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে শরীরের পুষ্টি শোষণ ব্যাহত হয়, যা ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাসের কারণ হতে পারে:
•অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস: খাবার থেকে পুষ্টি সঠিকভাবে শোষণ না হওয়ায় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ওজন কমে যায়।
•অনিচ্ছাকৃত ওজন বৃদ্ধি: কিছু ক্ষেত্রে, লিভারের কার্যকারিতা কমে গেলে শরীরে টক্সিন জমে এবং metabolism ধীর হয়ে যায়, যা ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
৪. ত্বকের সমস্যা
লিভার শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করার প্রধান অঙ্গ। যখন লিভার সঠিকভাবে কাজ করে না, তখন এই টক্সিনগুলি শরীরে জমে যায় এবং ত্বকে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করে:
•জন্ডিস: ত্বক এবং চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, যা বিলিরুবিন (bilirubin) নামক পদার্থের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে হয়।
•ত্বকে চুলকানি: শরীরে টক্সিন জমার কারণে ত্বকে চুলকানি হতে পারে।
•ত্বকে ফুসকুড়ি বা দাগ: বিভিন্ন ধরনের ত্বকের ফুসকুড়ি বা কালো দাগ দেখা দিতে পারে।
আরো পড়ুন : পিঠের ব্যথার জন্য ৪টি সেরা যোগাসন
৫. পেটে ব্যথা এবং ফোলা
লিভারের সমস্যা হলে পেটের উপরের ডান অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে। এছাড়াও, লিভারের ক্ষতির কারণে পেটে তরল জমা হতে পারে, যা অ্যাসাইটিস (ascites) নামে পরিচিত এবং এর ফলে পেট ফুলে যায়।
৬. ক্ষুধা হ্রাস এবং বমি বমি ভাব
লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হয় এবং ক্ষুধা কমে যায়। এর সাথে বমি বমি ভাব বা বমি হওয়ার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
৭. প্রস্রাব ও মলের পরিবর্তন
লিভারের কার্যকারিতা কমে গেলে প্রস্রাব গাঢ় হলুদ বা বাদামী রঙের হতে পারে এবং মল ফ্যাকাশে বা কাদামাটির মতো হতে পারে, কারণ পিত্তরস সঠিকভাবে মলের সাথে মিশতে পারে না।
লিভারের হজম শক্তি কমে যাওয়ার কারণ
লিভারের হজম শক্তি কমে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে কিছু প্রধান কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
•ফ্যাটি লিভার: লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে লিভারের কার্যকারিতা কমে যায়।
•অতিরিক্ত মদ্যপান: অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারের কোষগুলিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং লিভারের কার্যকারিতা হ্রাস করে।
•ভাইরাল হেপাটাইটিস: হেপাটাইটিস A, B, C, D, E ভাইরাস লিভারকে আক্রান্ত করে এবং এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
•কিছু ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু ঔষধ লিভারের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
•অপুষ্টি বা অতিরিক্ত পুষ্টি: সঠিক পুষ্টির অভাব বা অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়া লিভারের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে।
•অটোইমিউন রোগ: কিছু অটোইমিউন রোগ লিভারকে আক্রমণ করতে পারে।
আরো পড়ুন : অম্বল কমানোর খাবার: কী খাবেন, কী খাবেন না?
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
যদি আপনি উপরের লক্ষণগুলির মধ্যে কোনটি অনুভব করেন, বিশেষ করে যদি তা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা গুরুতর আকার ধারণ করে, তবে অবিলম্বে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা লিভারের গুরুতর ক্ষতি প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে।
উপসংহার
লিভার আমাদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, এবং এর হজম শক্তি কমে গেলে তা overall স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সঠিক জীবনযাপন, সুষম খাদ্য এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে লিভারকে সুস্থ রাখা সম্ভব। যদি কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং লিভারের স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতন হন।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
১. লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে কী ধরনের হজমের সমস্যা হয়?
> লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে পেট ফাঁপা, গ্যাস, বদহজম, বুক জ্বালাপোড়া, পেট ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
২. লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে কি ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব হয়?
> হ্যাঁ, লিভার শরীরের শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর কার্যকারিতা কমে গেলে শরীর পর্যাপ্ত শক্তি তৈরি করতে পারে না, যার ফলে অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং দুর্বলতা অনুভব হয়।
৩. লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে কি ওজন পরিবর্তন হতে পারে?
>হ্যাঁ, লিভারের হজম শক্তি কমে গেলে পুষ্টি শোষণ ব্যাহত হয়, যার ফলে অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস বা বৃদ্ধি উভয়ই হতে পারে।
৪. ত্বকের সমস্যা কি লিভারের হজম শক্তি কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে?
> হ্যাঁ, লিভার শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে না পারলে ত্বকে জন্ডিস, চুলকানি, ফুসকুড়ি বা কালো দাগ দেখা দিতে পারে।
৫. লিভারের হজম শক্তি কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলো কী কী?
> ফ্যাটি লিভার, অতিরিক্ত মদ্যপান, ভাইরাল হেপাটাইটিস, কিছু ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অপুষ্টি বা অতিরিক্ত পুষ্টি এবং অটোইমিউন রোগ লিভারের হজম শক্তি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ।
৬. কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
> যদি আপনি দীর্ঘস্থায়ীভাবে বা গুরুতর আকারে লিভারের হজম শক্তি কমে যাওয়ার লক্ষণগুলি অনুভব করেন, তবে অবিলম্বে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

