প্রস্টেট ক্যান্সার পুরুষদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ক্যান্সার, বিশেষ করে যাঁদের বয়স ৫০ বছরের বেশি। সমস্যাটা এখানেই—এই ক্যান্সারটি অনেক সময় একেবারেই নীরবে বেড়ে ওঠে। শুরুতে শরীর কোনো বড় সংকেত দেয় না। ফলে অনেক পুরুষ তখনই বিষয়টি জানতে পারেন, যখন রোগটি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছে।
তবে আশার কথা হলো, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রস্টেট ক্যান্সার এখন আগেভাগেই ধরা সম্ভব। আর যদি সময়মতো ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসা শুরু করা যায়, তাহলে সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও খুব ভালো।
এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় জানব—প্রস্টেট ক্যান্সারের সম্ভাব্য লক্ষণ কী, কীভাবে ডায়াগনোসিস করা হয়, PSA টেস্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং কখন বায়োপসি দরকার হয়।
Symptoms of prostate-cancer: প্রস্টেট ক্যান্সারের সম্ভাব্য লক্ষণগুলো
অনেক ক্ষেত্রেই প্রস্টেট ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ থাকে না। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে শরীর ছোট ছোট সংকেত দিতে শুরু করে। যেমন প্রস্রাব করার সময় জ্বালা বা ব্যথা অনুভব হওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ—বিশেষ করে রাতে, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া বা মাঝপথে থেমে যাওয়া, প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া, কিংবা দীর্ঘদিন ধরে কোমর, পিঠ বা হাঁটুতে ব্যথা থাকা। কারও ক্ষেত্রে ইরেকশনের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—এই লক্ষণগুলো শুধু ক্যান্সারের কারণেই হয় এমন নয়। অনেক সময় BPH (Benign Prostatic Hyperplasia) বা প্রস্টেট ইনফেকশনেও এমন উপসর্গ দেখা যায়। তবুও ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ উপেক্ষা করা উচিত নয়।
আরও পড়ুন: পেট ফাঁপা, ভারী লাগা, বদহজম—এই সমস্যাগুলো কেন হয় আর কীভাবে স্বাভাবিক হজম ফিরিয়ে আনবেন
প্রস্টেট ক্যান্সার কীভাবে ডায়াগনোসিস করা হয়
প্রস্টেট ক্যান্সার নিশ্চিত করার জন্য একাধিক ধাপে পরীক্ষা করা হয়। একটি পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না।
PSA টেস্ট কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
PSA বা Prostate-Specific Antigen টেস্ট একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা। এতে প্রস্টেট গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত PSA প্রোটিনের মাত্রা মাপা হয়। সাধারণত PSA যদি ৪ ng/mL-এর নিচে থাকে, তাহলে তা স্বাভাবিক ধরা হয়। ৪ থেকে ১০-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে ঝুঁকির অঞ্চল বলা হয়, আর ১০-এর বেশি হলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
তবে মনে রাখতে হবে, PSA বাড়ার মানেই ক্যান্সার—এমনটা নয়। প্রস্টেট ইনফেকশন বা BPH থাকলেও PSA বেড়ে যেতে পারে। তাই PSA টেস্ট মূলত একটি স্ক্রিনিং টুল, চূড়ান্ত ডায়াগনোসিস নয়।
ডিজিটাল রেকটাল এক্সাম (DRE)
এই পরীক্ষায় ডাক্তার মলদ্বারের মাধ্যমে আঙুল দিয়ে প্রস্টেট গ্রন্থি পরীক্ষা করেন। এতে প্রস্টেটের আকার, শক্তভাব বা কোনো অস্বাভাবিক গাঁট আছে কিনা বোঝা যায়। যদি প্রস্টেট অস্বাভাবিক মনে হয়, তখন আরও উন্নত পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মাল্টিপ্যারামেট্রিক MRI (mpMRI)
আধুনিক চিকিৎসায় mpMRI একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রস্টেটের বিস্তারিত 3D ছবি পাওয়া যায়। এতে ক্যান্সার কোথায় আছে, কতটা ছড়িয়েছে এবং কতটা আক্রমণাত্মক—এসব বিষয় বোঝা সহজ হয়।
বায়োপসি—চূড়ান্ত প্রমাণ
যদি PSA বা MRI রিপোর্টে সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়, তখন বায়োপসি করা হয়। এই পরীক্ষায় প্রস্টেট থেকে ছোট ছোট টিস্যুর নমুনা নিয়ে ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। ক্যান্সার সেল আছে কিনা, সেটি বায়োপসিতেই নিশ্চিতভাবে ধরা পড়ে।
বর্তমানে অনেক হাসপাতালে MRI-ফিউশন বায়োপসি ব্যবহার করা হয়, যা তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুল এবং কম কষ্টদায়ক।
কারা প্রস্টেট ক্যান্সার স্ক্রিনিং করাবেন
যাঁদের বয়স ৫০ বছরের বেশি, তাঁদের নিয়মিত স্ক্রিনিং নিয়ে ভাবা উচিত। যদি পরিবারের কারও (বাবা বা ভাই) প্রস্টেট ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে, তাহলে ৪৫ বছর থেকেই স্ক্রিনিং শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিছু উচ্চঝুঁকির গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ৪০ বছর থেকেই নজরদারি দরকার হতে পারে।
তবে স্ক্রিনিং করানোর আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি, কারণ অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা মানসিক চাপ বা অতিরিক্ত চিকিৎসার কারণ হতে পারে।
প্রতিরোধ ও সচেতনতা—আপনার করণীয়
প্রস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে শতভাগ নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু ঝুঁকি কমানো যায়। নিয়মিত চেকআপ, স্বাস্থ্যকর খাবার, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা—এসব অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে উপকার করে।
শেষ কথা:
আজকের দিনে প্রস্টেট ক্যান্সার আর আগের মতো ভয়ের নাম নয়। রোগ যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে (Stage I বা II), তাহলে চিকিৎসায় সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু তার জন্য দরকার সচেতনতা এবং সময়মতো পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত।
আপনি যদি ৫০ বছরের বেশি বয়সী হন, বা পরিবারের ক্যান্সারের ইতিহাস থাকে—তাহলে আজই একজন ইউরোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। একটি ছোট পরীক্ষা আপনার ও আপনার পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
আরও পড়ুন:First Time Sex: প্রথমবার সেক্সে একজন পুরুষ সাধারণত কতক্ষণ টিকে থাকেন?
প্রায়শই জিজ্ঞাসা করা প্রশ্ন (FAQ)
প্রস্টেট ক্যান্সার কি সব সময় লক্ষণ দেখায়?
না। অনেক ক্ষেত্রেই শুরুতে কোনো লক্ষণ থাকে না। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং খুব গুরুত্বপূর্ণ।
PSA বেশি মানেই কি ক্যান্সার?
না। PSA ইনফেকশন বা BPH-এর কারণেও বাড়তে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও পরীক্ষা দরকার।
বায়োপসি কি খুব কষ্টকর?
বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে বায়োপসি তুলনামূলকভাবে কম কষ্টদায়ক এবং নিরাপদ।
প্রস্টেট ক্যান্সার কি পুরোপুরি ভালো হয়?
হ্যাঁ। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসায় সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
স্ক্রিনিং করালে কি অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসার ঝুঁকি থাকে?
কিছু ক্ষেত্রে থাকতে পারে। তাই স্ক্রিনিংয়ের আগে ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি।

