বাঙালি মানেই ভাত ছাড়া চলে না। কিন্তু ডায়াবেটিস ধরা পড়লে প্রথমেই প্রশ্ন আসে, “এবার কি ভাত খাওয়া ছেড়েই দিতে হবে?” উত্তরটা হলো, একদমই না! আসল কথা হলো, সঠিক চাল বেছে নেওয়া এবং পরিমাণ মতো খাওয়া। বাজারে নানা ধরনের চাল পাওয়া যায়, তবে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সাদা এবং লাল চালের মধ্যে কোনটি বেশি উপকারী, তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে। চলুন, এই বিষয়টি সহজভাবে জেনে নেওয়া যাক।
কেন চাল নিয়ে এত আলোচনা?
ভাত আমাদের প্রধান কার্বোহাইড্রেট বা শর্করার উৎস। আমরা যে চালের ভাত খাই, তা আমাদের রক্তে শর্করার মাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। সাদা চাল খুব তাড়াতাড়ি হজম হয়ে রক্তে দ্রুত শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। একে বলা হয় উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (High Glycemic Index)। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এমন খাবার বেছে নেওয়া উচিত যা রক্তে ধীরে ধীরে শর্করা মেশায়, অর্থাৎ যার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) কম।
সাদা চাল বনাম লাল চাল: কোনটি বাছবেন?
সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে, আসুন দুটি চালের মধ্যে প্রধান পার্থক্যগুলো দেখে নিই।
বাঙালি হিসাবে আমাদের করণীয়
আমাদের বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই সাদা চালের ভাত খাওয়ার অভ্যাস। তবে স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে লাল চালকে খাদ্যতালিকায় যোগ করা একটি বুদ্ধিমানের কাজ। লাল চালের ভাতে বাদামের মতো একটি সুন্দর স্বাদ আছে যা আপনার ভালো লাগতে পারে। এটি শুধু ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেই সাহায্য করে না, এর উচ্চ ফাইবার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হজমশক্তি ভালো রাখতেও সাহায্য করে।
অতীতে গ্রামবাংলায় ঢেঁকিছাঁটা চাল খাওয়ার প্রচলন ছিল, যা ছিল লাল চালের মতোই পুষ্টিকর। এখন স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে সেই পুরনো অভ্যাসই নতুন করে ফিরে আসছে।
আরও পড়ুন: Healthy Bengali Breakfast : ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ৫টি স্বাস্থ্যকর বাঙালি জলখাবার
ডায়াবেটিসে কোন চালের ভাত খেলে রক্তশর্করা কম থাকে
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য লাল চাল বা বাদামী চালের (Brown Rice) ভাত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
এর প্রধান কারণ হলো গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (Glycemic Index – GI), যা পরিমাপ করে কোনো খাবার কত দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়।
- লাল চাল (Red Rice): এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম (সাধারণত ৫৫-এর কাছাকাছি)। এর অর্থ হলো, এই চালের ভাত হজম হতে বেশি সময় নেয় এবং শর্করা ধীরে ধীরে রক্তে মেশে। ফলে, রক্তে সুগারের মাত্রা হঠাৎ করে বেড়ে যায় না এবং নিয়ন্ত্রণে থাকে। এছাড়া এতে ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের পরিমাণও বেশি থাকে।
- সাদা চাল (White Rice): এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক বেশি (প্রায় ৭৩ বা তারও বেশি)। এই চালের ভাত খাওয়ার পর খুব দ্রুত হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ করেই অনেকটা বাড়িয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
- সুতরাং, রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে এবং ডায়াবেটিস ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল বা বাদামী চালের ভাত খাওয়া নিঃসন্দেহে একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প।
কিছু জরুরি বিষয় মনে রাখবেন
- পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ: লাল চাল স্বাস্থ্যকর হলেও, যেকোনো খাবারই পরিমাণ মতো খাওয়া উচিত। আপনার ডায়েটিশিয়ান বা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ভাতের পরিমাণ নির্দিষ্ট করুন।
- ডাক্তারের পরামর্শ: আপনার শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী কোন চাল বা কী পরিমাণ খাবেন, তা একজন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জেনে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
সারসংক্ষেপ
পুষ্টিগুণ এবং স্বাস্থ্যগত সুবিধার দিক থেকে বিচার করলে, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সাদা চালের চেয়ে লাল চাল নিঃসন্দেহে একটি ভালো বিকল্প। এর কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, উচ্চ ফাইবার এবং প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে দারুণভাবে সাহায্য করে। তবে এর মানে এই নয় যে আপনাকে সাদা চাল পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে। বিশেষ অনুষ্ঠানে বা মাঝে মাঝে পরিমাণ মতো সাদা চাল খেতেই পারেন।
আমার পরিচিত অনেকেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখন নিয়মিত লাল চালের ভাত খান এবং তাঁরা বেশ উপকার পেয়েছেন।
আপনি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন চালের ভাত খান? আপনার অভিজ্ঞতা নিচের কমেন্টে আমাদের সাথে শেয়ার করুন

