ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ বাঙালি মিষ্টির রেসিপি

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ বাঙালি মিষ্টির রেসিপি

Share This Post

বাঙালির জীবনে মিষ্টি ছাড়া উৎসব-আনন্দ ভাবাটাই কঠিন। শেষ পাতে একটু মিষ্টি না হলে যেন খাওয়াটা সম্পূর্ণ হয় না। কিন্তু ডায়াবেটিস ধরা পড়লে মিষ্টির প্লেটটা যেন এক ধাক্কায় অনেক দূরে সরে যায়। আপনারও কি মনে হয় ডায়াবেটিস মানেই মিষ্টিকে চিরতরে বিদায় জানানো? একদমই না! আজ আমি আপনাদের জন্য এমন কিছু বাঙালি মিষ্টির রেসিপি নিয়ে এসেছি, যা আপনি নিরাপদে খেতে পারবেন। এই রেসিপিগুলো स्वाद এবং স্বাস্থ্য, দুটোই মাথায় রেখে তৈরি।


কেন মিষ্টি নিয়ে এত সতর্কতা?

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মিষ্টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রচলিত বাঙালি মিষ্টি, যেমন রসগোল্লা, সন্দেশ বা পান্তুয়া, সাধারণত চিনি বা গুড় এবং উচ্চ ফ্যাটযুক্ত ছানা দিয়ে তৈরি হয়। এই উপাদানগুলি রক্তে শর্করার মাত্রা খুব দ্রুত বাড়িয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। চিনির উচ্চ গ্লাইসেমিক ইনডেক্স এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি, দুটিই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এর মানে এই নয় যে আপনাকে মিষ্টির স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হবে।


ডায়াবেটিস-ফ্রেন্ডলি মিষ্টির রেসিপি

সঠিক উপাদান বেছে নিলে এবং রান্নার পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন আনলে বাড়িতেই তৈরি করা সম্ভব স্বাস্থ্যকর মিষ্টি।

১. চিনি-মুক্ত ছানার সন্দেশ

সন্দেশ বাঙালির অন্যতম প্রিয় মিষ্টি। এটিকে ডায়াবেটিস-ফ্রেন্ডলি বানানো যায়।

  • উপকরণ:
    • ঘরে তৈরি ছানা বা পনির: ২৫০ গ্রাম
    • সুগার সাবস্টিটিউট (যেমন স্টিভিয়া ড্রপস): ১০-১২ ফোঁটা বা স্বাদ অনুযায়ী
    • ছোট এলাচ গুঁড়ো: ১/৪ চা চামচ
    • ঐচ্ছিক: সাজানোর জন্য পেস্তা বা আমন্ড কুচি
  • কীভাবে বানাবেন:
    ১. প্রথমে ছানা বা পনির একটি থালায় নিয়ে হাতের তালু দিয়ে খুব ভালোভাবে মসৃণ হওয়া পর্যন্ত মেখে নিন
    ২. একটি নন-স্টিক প্যানে মাখা ছানা নিয়ে অল্প আঁচে ২-৩ মিনিট নাড়াচাড়া করুন।
    ৩. মিশ্রণটি সামান্য ঘন হতে শুরু করলে আঁচ বন্ধ করে দিন।
    ৪. এবার এতে স্টিভিয়া এবং এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে নিন
    ৫. মিশ্রণটি ঠান্ডা হলে হাতে সামান্য ঘি মেখে ছোট ছোট বলের আকারে গড়ে নিন অথবা আপনার পছন্দের ছাঁচে ফেলে সন্দেশের আকার দিন
  • কেন স্বাস্থ্যকর: এতে চিনি নেই এবং এটি প্রোটিনে ভরপুর, যা রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে

আরও পড়ুন: ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ৫টি স্বাস্থ্যকর বাঙালি জলখাবার

২. সুগার-ফ্রি মিষ্টি দই

বাঙালির আর এক দুর্বলতা হলো মিষ্টি দই। চিনি ছাড়া এটিও তৈরি করা সম্ভব।

  • উপকরণ:
    • কম ফ্যাটযুক্ত দুধ: ১ লিটার
    • দইয়ের সাজা বা আগের দই: ২ চামচ
    • সুগার সাবস্টিটিউট (যেমন স্টিভিয়া): স্বাদ অনুযায়ী
  • কীভাবে বানাবেন:
    ১. দুধ একটি পাত্রে নিয়ে জ্বাল দিয়ে অর্ধেক করে নিন।
    ২. দুধ ঘন হয়ে এলে আঁচ থেকে নামিয়ে সামান্য ঠান্ডা হতে দিন। এটি যেন ঈষদুষ্ণ থাকে।
    ৩. এবার এতে স্টিভিয়া এবং দইয়ের সাজা ভালো করে মিশিয়ে দিন।
    ৪. মিশ্রণটি একটি মাটির পাত্রে ঢেলে উষ্ণ জায়গায় ৪-৫ ঘণ্টা বা সারারাত জমতে দিন।
    ৫. জমে গেলে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।
  • কেন স্বাস্থ্যকর: এটি চিনি-মুক্ত এবং কম ফ্যাটযুক্ত দুধ দিয়ে তৈরি হওয়ায় ক্যালোরি অনেক কম।

৩. স্বাস্থ্যকর পাটিসাপটা

শীতকালের এই ঐতিহ্যবাহী পিঠেকেও স্বাস্থ্যকর বানানো যায়।

  • উপকরণ (প্যানকেকের জন্য):
    • জোয়ার বা গমের আটা: ১ কাপ
    • সুজি: ২ টেবিল চামচ
    • দুধ (কম ফ্যাটযুক্ত): পরিমাণ মতো
  • উপকরণ (পুরের জন্য):
    • নারকেল কোরা: ১ কাপ
    • খেজুর বাটা: ২-৩টি
    • সুগার সাবস্টিটিউট (ঐচ্ছিক)
  • কীভাবে বানাবেন:
    ১. প্যানকেকের সমস্ত উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে একটি মসৃণ গোলা তৈরি করুন।
    ২. পুরের জন্য নারকেল কোরা এবং খেজুর বাটা একসঙ্গে মিশিয়ে একটি নন-স্টিক প্যানে হালকা আঁচে নেড়ে নিন।
    ৩. এবার একটি প্যানে সামান্য তেল ব্রাশ করে গোলা থেকে পাতলা প্যানকেক তৈরি করুন।
    ৪. প্যানকেকের মাঝে নারকেলের পুর দিয়ে মুড়ে নিলেই তৈরি আপনার স্বাস্থ্যকর পাটিসাপটা।
  • কেন স্বাস্থ্যকর: এতে ময়দার পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর আটা এবং চিনির পরিবর্তে প্রাকৃতিক মিষ্টি খেজুর ব্যবহার করা হয়েছে

আরও পড়ুন: ডায়াবেটিস থাকলে কোন চালের ভাত খাবেন? সাদা না লাল?


কিছু জরুরি বিষয় মনে রাখবেন

  • পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ: যেকোনো মিষ্টি, তা স্বাস্থ্যকর হলেও, পরিমাণে অল্প খাওয়াই উচিত। অতিরিক্ত খেলে তা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে
  • ডাক্তারের পরামর্শ: আপনার ডায়েটে কোনো নতুন খাবার যোগ করার আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তার বা ডায়েটিশিয়ানের সঙ্গে কথা বলুন। প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থা আলাদা, তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি

সারসংক্ষেপ

ডায়াবেটিস মানে জীবন থেকে মিষ্টির স্বাদ মুছে ফেলা নয়। বুদ্ধি করে উপাদান বেছে নিলে এবং রান্নার পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন আনলে আপনিও আপনার প্রিয় বাঙালি মিষ্টি উপভোগ করতে পারবেন। চিনি-মুক্ত সন্দেশ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যকর পাটিসাপটা—এই প্রতিটি রেসিপি আপনাকে উৎসবের দিনেও সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।

আমার এক আত্মীয় ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর এই রেসিপিগুলো চেষ্টা করে এখন উৎসবের দিনেও মিষ্টির স্বাদ থেকে বঞ্চিত হন না।

আপনারা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোন মিষ্টি খান? আপনাদের অভিজ্ঞতা বা রেসিপি নিচে কমেন্টে শেয়ার করুন


Share This Post